সিদ্ধিরগঞ্জে ডিএনডি লেক থেকে উদ্ধার হওয়া ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী মো. ইয়াছিন আরাফাত (১৭) হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৯ মাস পর চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পিবিআই। তদন্তে উঠে এসেছে, পরকীয়া সম্পর্কের সন্দেহ থেকেই মেধাবী এ শিক্ষার্থীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মূল আসামিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের একজন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন।
গ্রেপ্তাররা হলেন- সোনারগাঁয়ের বরাব এলাকার মো. আজিম হোসাইন (২৭), সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকার ফয়সাল (২৭) এবং রূপগঞ্জের মৈকুলী এলাকার নুসরাত জাহান মিম (২৪)।
রোববার (১০ মে) দুপুরে পিবিআই এর জেলা পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
পিবিআই সূত্র জানায়, গত ৫ মে ঢাকার ডেমরা এলাকা থেকে মূল আসামি আজিম হোসাইনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ মে সকালে শনিরআখড়া এলাকা থেকে ফয়সালকে এবং সন্ধ্যায় রূপগঞ্জের বরাব এলাকা থেকে নুসরাত জাহান মিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় মিমের কাছ থেকে একটি সোনালি রঙের রেডমি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, নিহত ইয়াছিন আরাফাত নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে শহরের উত্তর চাষাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। গত বছরের ১১ আগস্ট সন্ধ্যায় মায়ের জন্য ওষুধ কিনতে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তিনি। পরদিন তার পরিবার সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। দুই দিন পর ১৩ আগস্ট সকালে সিদ্ধিরগঞ্জের আশরাফ আলী অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনের সামনে ডিএনডি লেক থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় নিহতের মা আফরিনা নাসরিন সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে দীর্ঘদিনেও ঘটনার রহস্য উদঘাটন কিংবা জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি থানা পুলিশ। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তদন্তে বেরিয়ে আসে, গ্রেপ্তার আসামি আজিম হোসাইনের সঙ্গে নুসরাত জাহান মিমের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ২০২০ সালে তারা বিয়ে করেন। তবে দাম্পত্য জীবনে কলহ ও পরকীয়া সন্দেহ নিয়ে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। একপর্যায়ে তারা আলাদা থাকতে শুরু করেন।
পিবিআই বলছে, আলাদা থাকার পরও মিমের সঙ্গে আজিমের যোগাযোগ ছিল। ঘটনার প্রায় এক মাস আগে আজিম স্ত্রী মিমের বাসায় গেলে তার মেসেঞ্জারে ‘ইয়াছিন আরাফাত’ নামের এক ব্যক্তির বার্তা দেখতে পান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ওই ব্যক্তিকে ব্লক করে দেন। পরে মিমের সঙ্গে এ নিয়ে তার ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে আজিম জানতে পারেন, ইয়াছিন আরাফাত আসলে মিমের ফুফাতো ভাই। তবে মিম কখনো তাকে সেই পরিচয় স্পষ্ট করেননি। এতে ইয়াছিনকে স্ত্রীর প্রেমিক সন্দেহ করতে থাকেন আজিম।
তদন্তকারীরা জানান, এই সন্দেহ থেকেই আজিম তার বন্ধু ফয়সালকে নিয়ে ইয়াছিনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ঘটনার দিন ১১ আগস্ট সন্ধ্যায় ইয়াছিন বাসা থেকে বের হলে আগে থেকে ওত পেতে থাকা আজিম ও ফয়সাল তাকে কৌশলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে সিদ্ধিরগঞ্জের দিকে নিয়ে যান। পরে আরও কয়েকজন সহযোগী সিএনজিতে ওঠে। একপর্যায়ে আশরাফ আলী ফিলিং স্টেশনের সামনে ডিএনডি লেকপাড় এলাকায় নিয়ে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে ইয়াছিনকে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ লেকে ফেলে দেওয়া হয়।
পিবিআই আরও জানায়, গ্রেপ্তারের পর আজিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। অন্য দুই আসামিকেও আদালতে পাঠানো হলে তাদের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পিবিআই জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত আরও অজ্ঞাতনামা আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।