সিদ্ধিরগঞ্জে ফ্রিজের কম্প্রেসার বিস্ফোরণে সৃষ্ট আগুনে দগ্ধ হয়েছেন একই পরিবারের নয়জন। তাদের মধ্যে বেশির ভাগের অবস্থা আশঙ্কাজনক। শরীরের ৩০ থেকে ৫৩ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে তাদের। এখন ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চলছে জীবন-মৃত্যুর লড়াই।
শুক্রবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ৩টার দিকে নাসিক ১ নম্বর ওয়ার্ডের রনি সিটি আবাসিক এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। স্থানীয় কলা ব্যবসায়ী এরশাদুল মিয়া তখন পাশের গোডাউনে কলা নামাচ্ছিলেন।
তিনি বললেন- “হঠাৎ বিকট এক আওয়াজ হলো। দৌড়ে গিয়ে দেখি বাড়ির ভেতরে আগুন আর কান্নাকাটি। কয়েকজন মহিলার শরীর আর কাপড় পুড়ে গিয়েছিল। একটা বাচ্চা ছিল, তার অবস্থা ভয়াবহ। দেখেই গা শিউরে উঠেছিল।”
প্রতিবেশীদের সহায়তায় দ্রুত আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরশাদুল মিয়া আরও বলেন-“বাড়ির অবস্থা ভয়ঙ্কর ছিল। উপরের টিন উঠে গেছে, আমপারা পুরো পুড়ে গেছে। প্লাস্টিকের চেয়ার গলে গেছে। ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল জুতো, বাচ্চাদের খেলনা, পোড়া আসবাব। তাপে প্রায় সব প্লাস্টিক জিনিস গলে গিয়েছিল।”
স্থানীয়রা বলেন, সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল এলাকায় জাকির খন্দকারের টিনসেড বাড়ির তিনটি রুম ভাড়া নিয়ে ১০/১২ জনের যৌথ পরিবার বসবাস করেন। শুক্রবার রাত সাড়ে তিনটার এক ঘরের বাসিন্দা হোসিয়ারি ব্যবসায়ি হাসানের রুমে বৈদ্যুতিক সর্টসার্কিট থেকে আগুন ছড়িয়ে বিকট শব্দে ফ্রিজের কম্প্রেসার বিস্ফোরণ হয়। এসময় ঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের আরে দুটি ঘরে।
আগুনে দগ্ধ হন হাসান, তার স্ত্রী সালমা, তাদের চার মাস বয়সের শিশু সন্তান রায়হান, চার বছর বয়সের কন্যা সন্তান জান্নাত, আট বছর বয়সের মেয়ে মুনতাহা সহ পরিবারটির পাঁচজন। তাদের পাশের ঘরে প্রতিবেশী পোশাক কারখানার শ্রমিক বিথি ও তার দুই সন্তানও দগ্ধ হন বিস্ফোরণের এই আগুন। ওই তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে পাশের বাড়ির প্রতিবেশী তানজিল আহত হয়। পরে খবর পেয়ে আদমজী ইপিজেড ফায়ার স্টেশনের দুইটি ইউনিট গিয়ে আগুন নির্বাপন করে।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, হাসান (৩৭) – শরীরের ৪৪% দগ্ধ, সালমা (৩০) – ৪৮%, আসমা (৩৫) – ৪৮%, তিসা (১৬) – ৫৩%, জান্নাত (৪) – ৪০%, মুনতাহা (১১) – ৩৭%, শিশু ইমাম (৪ মাস) – ৩০%, আরাফাত (১৩) – ১৫% এবং তনজিল ইসলাম (৪০) – প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক সার্জন ডা. সুলতান মাহমুদ শিকদার জানান, “শিশুসহ আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। শুধু তনজিল ইসলামকে ছাড়া হয়েছে।”
আদমজী ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা মো. মিরণ মিয়া বলেন, “প্রাথমিক ধারণা, ফ্রিজের কম্প্রেসারে শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।”
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি শাহীনুর আলম জানান, “আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দগ্ধ কাউকে পাইনি। স্থানীয়রা আগেই তাঁদের হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।”
প্রতিবেশী রুবেল হোসেন বললেন, “ভেতর থেকে বাচ্চাদের কান্না শোনা যাচ্ছিল। জানালার পাশে হাত নাড়তে দেখেছি। কিন্তু আমরা কিছু করতে পারিনি। সেই দৃশ্য চোখে লেগে আছে।”
আগুনে পোড়া টিনশেড ভাড়া বাড়িটিতে এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ। ছাইয়ের মাঝে পড়ে আছে বাচ্চাদের জুতো, পুড়ে যাওয়া চেয়ার আর গলে যাওয়া প্লাস্টিকের খেলনা। একসময় যেখানে সংসারের হাসি-খুশি ছিল, সেখানে এখন শুধু পুড়ে যাওয়া দেয়াল আর শোকের নীরবতা।