নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল আবাসিক এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ও প্লাস্টিক কভারবিহীন তারের সঞ্চালন লাইন এখন বাসিন্দাদের কাছে আতঙ্কের আরেক নাম। বহুতল ভবনের দুই ও তিনতলার বারান্দা এবং জানালার গা ঘেঁষে ঝুঁকিপূর্ণভাবে টানানো বিদ্যুতের তার প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকিতে ফেলছে শতাধিক পরিবারকে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বয়স্করা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি সরেজমিনে হীরাঝিল আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়ক, ৩ নম্বর সড়ক ও মুক্তি সরণি ঘুরে দেখা যায়, কয়েকটি বহুতল ভবনের বারান্দা ও জানালার এত কাছ দিয়ে ট্রান্সমিটার ও এইচটি বিদ্যুতের লাইন গেছে যে, সামান্য হাত বাড়ালেই স্পর্শ করা সম্ভব। কোথাও কোথাও তার ঝুলে আছে, আবার কোথাও ভবনের সম্প্রসারণের কারণে নিরাপদ দূরত্ব প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। নিরাপত্তাবিধি অনুযায়ী যে দূরত্ব বজায় রাখার কথা, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ খন্দকার বলেন, “প্রতিদিন ভয় নিয়ে বাসা থেকে বের হই, আবার ভয় নিয়েই ফিরি। আমাদের বাসায় ছোট বাচ্চা আছে। বারান্দায় খেলতে দিতে পারি না। এক মুহূর্তের অসাবধানতাই বড় দুর্ঘটনা ডেকে আনতে পারে।”
গৃহিণী মোসা. তাহেরা আক্তার বলেন, “গরমের সময় জানালা খুলে রাখা যায় না। কাপড় শুকাতে গেলেও ভয় লাগে। বিদ্যুতের তার এত কাছে যে, যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা বহুবার অভিযোগ করেছি, কিন্তু কেউ এসে দেখেও যায়নি।
মুক্তি সরণির বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, দুর্ঘটনা ঘটার অপেক্ষায় আছে সবাই। কোনো প্রাণহানি হলে হয়তো তখন কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসবে। কিন্তু তার আগে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, এলাকায় অনেক শিশু বসবাস করে। তারা খেলতে গিয়ে প্রায়ই বারান্দা বা জানালার পাশে চলে যায়। এ অবস্থায় বিদ্যুতের তারের এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থান তাদের জীবনকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু এই তিনটি সড়কই নয়, হীরাঝিল আবাসিক এলাকার আরও কয়েকটি অংশে একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। ভবন নির্মাণের পর লাইন স্থানান্তর বা নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত না করায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
এলাকাবাসীর দাবি, জরুরি ভিত্তিতে পুরো এলাকায় কারিগরি জরিপ পরিচালনা করে ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইন অপসারণ বা স্থানান্তর করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসিক ভবনের বারান্দা বা জানালার এত কাছ দিয়ে বিদ্যুতের লাইন থাকা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। নিয়মিত পরিদর্শন, ঝুঁকিপূর্ণ লাইন স্থানান্তর এবং নিরাপত্তা মান নিশ্চিত না করলে যেকোনো সময় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
হীরাঝিল সমাজকল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল মতিন বলেন, “এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। অনেক আগেই আমরা ডিপিডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত ও মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছি। বিশেষ করে আবাসিক এলাকার ভবনের বারান্দা ও জানালার এত কাছ দিয়ে খোলা বিদ্যুতের তার চলে যাওয়ায় যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে তাদের সতর্ক করেছি। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, অন্তত ঝুঁকিপূর্ণ সব বৈদ্যুতিক তার যেন দ্রুত ইনসুলেটেড (কাভার) করা হয় অথবা নিরাপদ দূরত্বে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “এ এলাকায় অসংখ্য পরিবার বসবাস করে, অনেক ছোট ছোট শিশুও রয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা সব সময় উদ্বিগ্ন থাকি। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলে হারানো প্রাণ আর ফিরে আসবে না। তাই আমরা দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ লাইনগুলো নিরাপদ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
ডিপিডিসির সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুর রহমান বলেন, “হীরাঝিল আবাসিক এলাকার এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ লাইনের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। লিখিত বা মৌখিকভাবে অভিযোগ পাওয়া গেলে আমাদের কারিগরি দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবে।”
তিনি আরও বলেন, “পরিদর্শনে যদি দেখা যায় কোনো বিদ্যুৎ লাইন নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী স্থাপন করা হয়নি বা ভবনের খুব কাছ দিয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তাহলে প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ লাইন ইনসুলেটেড (কাভার) করা, স্থানান্তর করা বা নিরাপদ দূরত্ব নিশ্চিত করার যে ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা হবে। মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।”