সরকার বিধবা কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা দিলে সংসদ সদস্যের স্ত্রীই সবার আগে সেই কার্ড নেবেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, দেশে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে পরিবারতন্ত্রকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। চাকরির নিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বণ্টনেও সংসদ সদস্যদের পরিবারের সদস্যরা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে মহানগর ছাত্রশক্তির উদ্যোগে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
সারের ডিলারশিপে সংসদ সদস্যদের ছেলে, মেয়ে ও শ্যালিকাদের নিয়োগ পাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখছেন, কিছুদিন আগে একটা নিয়োগপ্রক্রিয়ার মতো হয়েছে, সারের ডিলারশিপে। সেখানে এমপির ছেলেও সারের ডিলারশিপ পেয়েছে, এমপির মেয়েও পেয়েছে, এমপির শালীও পেয়েছে।’
বিধবা ও বেকারদের জন্য সরকারি সহায়তার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইভেন বিধবা কার্ড যদি দেওয়া হয়, সে বিধবা কার্ডের টাকা যদি দেওয়া হয়, এমপির বউ সবার আগে পাবে! মানে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি হচ্ছে এমন যে বিধবা কার্ড এমপির বউ দেখা যাবে সবার আগে বলবে, “আমার একটা দাও।” আর বেকার কার্ড, এগুলো সবার আগে উনারা পাবে।’
দেশে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘এই নিচু মানসিকতার উপরে উঠে আম প্রজন্ম আপনারা যারা আছেন, আমরা যেন যোগ্যতা এবং মেধাকে সর্বোচ্চ জায়গায় প্রাধান্য দিয়ে একটা বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারি। সে ক্ষেত্রে আপনাদের সহায়তা চাই, আমরা চাই আপনারা আমাদের সহায়তা করবেন।’
বক্তব্যে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্যের সমালোচনা করে হাসনাত আবদুল্লাহ তাকে ‘গুন্ডা’ আখ্যা দেন। উপাচার্যের দায়িত্ব পালন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের সমর্থন না থাকার পরও তিনি পদ আঁকড়ে রয়েছেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘চুয়েটের একজন ভিসি গুন্ডা, বুঝছেন তো? এই গুন্ডা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাটা বোঝায়। উনাকে কোনো শিক্ষক চান না, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও চান না, তার সহকর্মীরাও চান না। নির্লজ্জের মতো আজকে তালা ভেঙে তিনি তার চেয়ার দখল করছেন।’
উপাচার্যের দায়িত্বে থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘গ্রামের ভাষায় কথা বললে, হাজব্যান্ড যদি ওয়াইফকে নিয়ে সংসার করতে না চায়, জোর করে গিয়ে সংসার করা যায়? মানে, তার তো ন্যূনতম লজ্জার একটা বিষয় আছে। তিনি কী করছেন, ছাত্রদলের কয়েকটা গুন্ডা নিয়ে তিনি রুমের তালা ভাঙছেন।’
চুয়েটের উপাচার্য নিয়োগের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার দাবি করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘তাকে সরকার চুয়েটে নিয়োগ দিয়েছে। তাকে নিয়োগ দেওয়ার পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস করা বন্ধ করে দিয়েছেন, চুয়েটের শিক্ষকেরা ক্লাস নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন, কর্মচারীরা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি গত কয়েক দিন ধরে, প্রায় এক মাস ধরে, চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে বসে বসে অনলাইনে তার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাকে নিতে চায় না, নির্লজ্জ, লজ্জা নাই!’
নিজের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ধরেন, আমাকে যদি এখানে দাওয়াত না দেওয়া হয়, আপনারা যদি বলেন যে না, আপনাকে লাগবে না, আমার কি ন্যূনতম লজ্জা আছে? আমি কি এখানে আসব, চেয়ার দখল করব?’
সমাজে ব্যক্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও নৈতিকতার অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘এই যে সমাজে এই ধরনের মানসিক অধঃপতনগুলো হচ্ছে, এই অধঃপতনের বিরুদ্ধে আপনাদের সব সময় সচেতন থাকতে হবে। এই চুয়েটের ভিসি নামক গুন্ডারা যারা আছে, যারা দেশটাকে আবার পিছিয়ে নিতে চায়, যাদের ন্যূনতম ব্যক্তিত্ব নাই, লজ্জা নাই, আত্মসম্মানবোধ নাই; যাদের ছাত্রদলের গুন্ডা নিয়ে নিজের চেয়ারে বসতে হয়, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়ায়, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়ায়, যাদের কাছে শিক্ষা থেকে পদ আরও বড় হয়ে ওঠে, ওই সব মানুষের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।’
এ ধরনের মানসিকতা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এসব মানুষ সব জায়গায় আছে—বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজ, বাজার-হাট, রাজনৈতিক মহল; সব জায়গায় এক ধরনের মানুষ আছে। আপনাদের যদি সম্ভব হয়, এই ধরনের মানুষের বিরুদ্ধে আপনাদের সচেতন মস্তিষ্ক যেন সব সময় একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘যাই হোক, আপনারা যারা আছেন, আপনাদের একটা উত্তম ভবিষ্যৎ আমরা কামনা করি। আপনাদের একটা উত্তম ভবিষ্যৎ হোক—যে ভবিষ্যতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, যে যে পেশায় যান, আমাদের কিছু আসে যায় না। দিন শেষে আপনি যেটাতে সুখী হন, আপনি যেটাতে শান্তি পান, আপনি যেটাতে সন্তুষ্ট হন, আপনার পরিবার যেটাতে সন্তুষ্ট হয় এবং দেশের যেটা কল্যাণ হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করি, আপনারা ওই ধরনের পেশাগুলোতেই যাবেন, ওই ধরনের কার্যক্রমগুলোই করবেন। ওই ধরনের পড়াশোনার মধ্য দিয়ে আপনাদের মনোজাগতিক বৃদ্ধি হবে, মনোজাগতিক বিকাশ হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ার মধ্যে আপনারা আরও বেশি সচেতনভাবে রাজনৈতিক মনস্ক হয়ে গড়ে উঠবেন।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে দেশ গঠনের প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা ভালো থাকেন, সুস্থ থাকেন। আপনাদের সঙ্গে আমাদের এই যাত্রার সহযাত্রী হচ্ছেন আপনারা। আপনাদের সঙ্গে শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে, পথে-প্রান্তরে আপনারাই হচ্ছেন আমাদের বৈধতা।’
নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভুল হতে পারে স্বীকার করে শিক্ষার্থীদের তা ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘এখানে আপনারা যারা আছেন, আমাদেরকে ওয়ার্ল্ড সেটেলমেন্টের কেউ বলেনি। কিন্তু আমরা যখন আপনাদের সঙ্গে কথা বলি, উই ফিল করি, একটা সেন্স অব উইননেস কাজ করে। সেজন্য আমরা আজকে এখানে যারা বসে আছি, আমাদের সিদ্ধান্তের মধ্যেও কিন্তু অনেক ভুল থাকবে। আমরাও ভুল করতে পারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ভুলগুলোকে আপনারা ধরিয়ে দেবেন, বলবেন যে কোনটা ভুল, আমরা এটা শুধরে নেব। কারণ আমরা একই সময়ের সন্তান, আমরা একই সময়ে বিলং করি। আমাদের যে ভুল হবে না, বিষয়টা এমন না। যখনই ভুল হয়, আপনারা আমাদের বলবেন। আমরা আমাদের ভুল শুধরে একটা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে আপনাদের নিয়ে হাঁটতে চাই।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন, এনসিপির মহানগর আহ্বায়ক শওকত আলী, জেলা এনসিপির আহ্বায়ক জুবায়ের সরদার এবং মহানগর ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক কমরেড আমিনুল ইসলামসহ অন্যরা। পরে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জিপিএ-৫ প্রাপ্ত পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।