এলাকায় ক্ষোভ, তদন্ত ও নতুন কমিটি গঠনের দাবি স্থানীয়দের
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল এলাকার বাইতুন নুর জামে মসজিদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদে নির্বাচিত হয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী মো. মতিন মিয়া এবং বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হত্যা মামলার অন্যতম আসামি দেলোয়ার হোসেন সরকার। এই দুই বিতর্কিত ব্যক্তির হাতে মসজিদের দায়িত্ব যাওয়ায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্টের পর থেকে দেলোয়ার হোসেন পলাতক থাকলেও, কীভাবে তিনি সাধারণ সম্পাদকের পদে নির্বাচিত হলেন তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, “ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের স্বার্থে মসজিদ পরিচালনা করছেন তারা।”
সভাপতি মো. মতিন মিয়া দীর্ঘদিন ধরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের গণসংযোগ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে প্রচারণায় নেতৃত্ব দেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি “শামীম ওসমানের প্রতিনিধি” পরিচয়ে এলাকায় সক্রিয় ছিলেন।
অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন সরকার বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত একাধিক হত্যা মামলার আসামি। তার ছোট ভাই মোক্তার হোসেনও ঐ আন্দোলনের মামলার আসামি এবং বর্তমানে হীরাঝিল সমাজ কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি।
এলাকাবাসীর দাবি, মসজিদের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের নামে সংগৃহীত তহবিলের বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে। কয়েকজন প্রাক্তন কমিটি সদস্য ও স্থানীয় ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, সভাপতি মতিন মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার মসজিদের নামে একটি জমি কেনার উদ্যোগ নেন এবং তহবিল থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই অর্থের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
একজন প্রাক্তন সদস্য বলেন, “মসজিদের নামে বাড়ি কেনার নামে বিশাল অঙ্কের টাকা তোলা হয়েছিল। এখন হিসাব চাইলে তারা রাগ করে। মসজিদের খরচের কোনো রেকর্ড বা রসিদ পর্যন্ত নেই।”
২০১২ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন মসজিদের সামনে রাস্তা নির্মাণের সময় মতিন মিয়া ও দেলোয়ারের সুপারিশে রাস্তা নিচু করে তৈরি করা হয়। এর ফলে বৃষ্টির সময় ড্রেনের পানি মসজিদের ভেতরে ঢুকে পড়ে, নামাজ আদায়ে বিঘ্ন ঘটে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ বলেন, “আমরা তখন বলেছিলাম রাস্তা উঁচু করে দিতে। কিন্তু তারা নিজেদের গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধার জন্য নিচু করে দিতে বলেছিল। এখন মুসল্লিরাই ভোগান্তি পোহাচ্ছে।”
স্থানীয় মুসল্লিরা অভিযোগ করেছেন, নামাজের সময় সভাপতি ও সম্পাদক নিজেদের জন্য প্রথম কাতারে বিশেষ জায়নামাজ রাখেন, অন্য কেউ সেখানে বসতে গেলে তারা নানা ইঙ্গিত বা আচরণে বাধা দেন।
একজন প্রবীণ মুসল্লি বলেন, “আগে সবাই সমানভাবে নামাজ পড়তাম। এখন মনে হয় মসজিদটা তাদের অফিসে পরিণত হয়েছে। আল্লাহর ঘরেও তারা রাজনীতির প্রভাব দেখাচ্ছে।”
একজন সমাজকর্মী মন্তব্য করেন, “মসজিদে নামাজ পড়তে গেলেও এখন ভয় লাগে। যারা তাদের বিরোধিতা করে, তাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলা হয়।”
প্রাক্তন কমিটি সদস্যদের অভিযোগ, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাচন হয়নি। স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এই পদ দু’টি তারা নিশ্চিত করেন।
একজন প্রাক্তন সদস্য বলেন, “যারা নিয়মিত নামাজ পড়েন, সমাজে গ্রহণযোগ্য— তাদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটা ধর্ম ও নীতির পরিপন্থী।”
বাইতুন নুর জামে মসজিদের সাধারণ মুসল্লি ও এলাকাবাসী এখন একটি স্বচ্ছ ও নির্বাচিত কমিটি গঠনের দাবি তুলেছেন। তাদের মতে, “বিতর্কিত ও মামলাবাজ ব্যক্তিদের হাতে মসজিদের দায়িত্ব থাকা মসজিদের মর্যাদা নষ্ট করছে।”
স্থানীয় রফিকুল ইসলাম বলেন, “মসজিদ মানে শান্তির জায়গা। সেখানে রাজনীতি বা অর্থকেলেঙ্কারিতে জড়িত লোকদের স্থান হওয়া উচিত নয়। আমরা চাই নতুনভাবে, এলাকার সবার অংশগ্রহণে কমিটি হোক।”
এলাকাবাসী প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কাছে তদন্ত দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, মসজিদের সম্পত্তি ও তহবিল ভবিষ্যতে দখলবাজির শিকার হতে পারে।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত শাহীনুর আলম বলেন বলেন, “বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচিত হলেও এখনও লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
যোগাযোগ করা হলে সভাপতি মো. মতিন মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমরা টাকা দিয়ে নয়, সমাজের মানুষের সমর্থনেই দায়িত্ব নিয়েছি। আমি আওয়ামী লীগের কর্মী— শামীম ওসমানের গণসংযোগে অংশ নেওয়াটা অপরাধ নয়। রাস্তা নিচু করা হয়েছিল সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলীর নির্দেশে।”
সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন সরকার বলেন, “আমার বিরুদ্ধে মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মসজিদের নামে জমি কেনার সব হিসাব আছে। কিছু মানুষ অপপ্রচার চালাচ্ছে।”