বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
আমাদের সমাজে ভালো মানুষের খুব অভাব : সিভিল সার্জন ডাকাতি করতে গিয়ে কিশোরীকে গণধর্ষণ: অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার ৪ আদমজী ব্লাড ডোনার্স গ্রুপের রক্ত দান কর্মসূচী ও চতুর্থ বর্ষপূর্তি উদযাপন ট্রাক চাপায় আড়াইহাজার পৌরসভার ইলেকট্রিশিয়ান নিহত: সড়ক অবরোধ ছাত্র ফেডারেশন নারায়ণগঞ্জ ৮ম জেলা কমিটির যাত্রা শুরু তাকে বার বার হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে: আব্দুল হাই সরকার নানা রকম ছলচাতুরি করে ষড়যন্ত্র করছে: জোনায়েদ সাকী পুলিশের উপর হামলার মামলা: গিয়াস উদ্দিনের জামিন না মঞ্জুর আজ শিক্ষকরা ছাত্রদের শাসন করতে ভয় পায়: অতি. পুলিশ সুপার নারায়ণগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগে মাত্র ২৩৫ টাকায় নিয়োগ পেলেন ৮৪ জন

২৯ নভেম্বর বক্তাবলী গণহত্যা দিবস

স্টাফ রিপোর্টার
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৩
  • ৯৩ Time View
২৯ নভেম্বর বক্তাবলী গণহত্যা দিবস

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার অন্যতম সাক্ষী নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বক্তাবলী। ১৯৭১ সালে এই দিনে দেশ যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার প্রত্যন্ত অঞ্চল বক্তাবলী পরগনার ২২টি গ্রামে। বক্তাবলীতে ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর ভোররাতে চালানো হয় নির্মম এক গণহত্যা । পাকিস্তানি সেনা সদস্যরা এ গণহত্যা চালায়। শুধু গণহত্যা নয়, তারা গানপাউডার দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেয় গ্রামের বাড়িঘর, জ্বালিয়ে দেয় ফসলি জমি, গোলার ফসল, গবাদিপশু। এ গণহত্যায় শহিদ হন এখানকার ১৩৯ জন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। বর্বরোচিত ওই হামলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে ১৩৯ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি নারী কিংবা শিশু। রাজাকার, আল-বদররা জ্বালিয়ে দিয়েছিল গ্রামের পর গ্রাম। মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসে ২৯ নভেম্বর দিনটি নারাণগঞ্জবাসীর জন্য বেদনাবিধুর দিন। স্বাধীনতাযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জে একসঙ্গে এত মানুষ হত্যার ঘটনা দ্বিতীয়টি আর নেই।

এখানকার গণহত্যায় যারা শহিদ হয়েছেন তাদের অনেকেই বক্তাবলীর স্থানীয় ছিলেন। আবার কেউ কেউ ছিলেন বক্তাবলীর বাইরের এলাকার। এ ছাড়া গণহত্যার শিকার অনেক শহিদের লাশ নদীতে ভেসেও গেছে। যারা শহিদ হয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন- ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, জেলেসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। এ শহিদের তালিকায় আছেন- ফজিলাতুন্নেছা নামে স্থানীয় একজন নারী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শহীদুল্লাহ, মুনীরুজ্জামান ও তার স্কুলপড়ুয়া ভাই শাহ আলমসহ আরও অনেকে। সেদিনের ঘটনায় এখানে শহিদদের একটি নামফলক বসানো রয়েছে

স্থানীয়রা জানান, এ গণকবরে ৮০ জন শহিদের লাশ দাফন করা হয়েছে। এ ছাড়া এ এলাকার বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে আছে আরও অনেক শহিদের কবর। বক্তাবলীর মানুষ শত শত মুক্তিযোদ্ধার থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। সেই সঙ্গে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহর ও জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে পালিয়ে আসা শত শত পরিবারের আশ্রয়স্থল ছিল বক্তাবলী। পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র ১৭ দিন আগে ঘটে বক্তাবলীর হৃদয় বিদারক হত্যাযজ্ঞ। স্বজন হারানোর ব্যথা ও কষ্ট নিয়েও শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতি বছরই পালিত হয় এই দিবসটি। বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীবেষ্টিত বক্তাবলী এলাকা মুক্তিযুদ্ধের সময় পরগনা ছিল। এখন সেটি ভেঙে তিনটি ইউনিয়ন পরিষদে রূপান্তরিত করা হয়েছে। শষ্যভান্ডারখ্যাত বক্তাবলীতে ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর ভোরে হানা দেয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। কুয়াশাঘেরা ওইদিন সুবেহ সাদেক শুরু হয় পাকিস্তানিদের গুলির শব্দে। দুটি নদীর পাড়ে গানবোট নিয়ে কয়েক প্লাটুন পাক সেনা হামলে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে । ২২টি গ্রাম থেকে নিরীহ ১৩৯ জনকে ধরে এনে নদীর পাড়ে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে পার্শ্ববর্তী লক্ষ্মীনগর গ্রামে স্তুপ করে রাখা হয়। কারও কারও লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয় নদীতে। ২২টি গ্রামের বাড়িঘর গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেয় পাক হানাদার বাহিনী।

বক্তাবলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারম সম্পাদক শওকত আলী জানান, বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করে মুক্তিযোদ্ধারা এখানে এসে থাকতেন। এ খবর রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের জানিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে এসে ২৯ নভেম্বর তারা এখানে হামলা চালায়। আমি বক্তাবলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসাবে বলতে চাই, স্বাধীনতা যুদ্ধে যেসকল লোক শহিদ হয়েছে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা সহ তাদের পরিবার যেন সরকারী ভাবে সুযোগ সুবিধা পায় সেই জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আমাদের এমপি শামীম ওসমানের সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।

তৎকালীন ডেপুটি কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা তমিজউদ্দিন রিজভী জানান, তারা মুজিব বাহিনীর অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষ করে বক্তাবলী ও এর আশপাশ গ্রামে অবস্থান নেন। ওই সময়ে বক্তাবলী গ্রামে এক থেকে দেড়শ মুক্তিযোদ্ধা ছিল। নদী বেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় এলাকাটিকে নিরাপদ মনে করতো মুক্তিযোদ্ধারা। বক্তাবলীতে অবস্থান করেই মূলত মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশন করার পরিকল্পনা করতো। ওই এলাকাতে তখন কমান্ডার ছিলেন সিরাজুল ইসলাম। এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের প্রয়াত যুগ্ম আহ্বায়ক মফিজুল ইসলাম, বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর আজহার হোসেন, আবদুর রব, মাহফুজুর রহমান, স ম নুরুল ইসলামসহ আরো অনেকে তখন বক্তাবলীতে অবস্থান করতেন। ঘটনার দিন তথা ২৯ নভেম্বর ছিল প্রচণ্ড শীত। সকাল থেকেই ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন ছিল পুরো এলাকা। নদী বেষ্টিত হওয়ায় কুয়াশা ছিল অনেক বেশি। ভোরের দিকে হঠাৎ করেই পাক বাহিনী গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। অপ্রস্তুত মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা জবাব দেয়। উভয় পক্ষের মধ্যে সম্মুখ বুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুন্সিগঞ্জ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ব্যাটালিয়ন বক্তাবলীতে এসে এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিলে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। পরে তারা একত্রে পাক বাহিনীর জঙ্গে প্রায় চার ঘণ্টা একটানা যুদ্ধ চালায়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা মোক্তারকান্দি কবরস্থানের সামনে কয়েকজন রাজাকারকে ধরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে পাক হানাদাররা পিছু হঠতে শুরু করে। এ সময় তারা রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর পরামর্শে ১৩৯ জন নিরন্তর গ্রামবাসীকে ধরে এনে লাইন ধরিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। চলে যাওয়ার সময় পাক হানাদার বাহিনী একে একে বক্তাবলী পরগনার ২২ গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। এদিকে বক্তাবলী দিবসটি পালনে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসহ নিহতদের পরিবারের পক্ষ হতে নানা ধরনের কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বক্তাবলীর বাসীন্দা ও নারায়নগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারন সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জীবন বলেন, সেদিন তার নিজের বাড়ীতেও আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলো পাক-হানাদার বাহিনী। তার আপন খালু আব্দুল মতিউর রহমান কে তার তিন ভাই সহ গুলি করে হত্যা করে পাক বাহিনী। কিন্ত অনুতাপের বিষয় হলো স্বাধীনতার ৫২ বছর পেরিয়ে গেলেও নিহতের পরিবারের কোন খোঁজ খবর নেয়নি সরকার। আরেকটি বিষয় হলো সরকারি ভাবে বক্তাবলীর এই বধ্যভূমী আজো স্বীকৃতি দেয়নি সরকার।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিদারুল ইসলাম বলেন, বক্তাবলী গণহত্যা দিবসটি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন গুরুত্ব দিয়ে পালন করে আসছে। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। সরকারিভাবে গণকবরটিকে বধ্যভূমি ঘোষণার দাবির সঙ্গে আমিও একমত। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
Translate »